<

p style=”text-align: justify;”>‘আমি পৌঁছে গেছি।’ লাবনীর সেলফোনের মেসেজ বক্সে ফুটে উঠল শব্দগুলো। ঘড়িতে সময় দেখল লাবনী। পাঁচটা বাজতে এখনো দশ মিনিট বাকি। হাতিরঝিল থেকে গুলশানের রাস্তায় নামার মুখে প্রচন্ড জ্যাম। একটা দুটো করে গাড়ি ছাড়ছে ট্রাফিক পুলিশ। সামনে পেছনে অকারণেই হর্ন বাজাচ্ছে গাড়িগুলো। একটা অ্যাম্বুলেন্স সেই তখন থেকে তীব্র চিৎকার করে যাচ্ছে। সেদিকে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। হাতিরঝিলের চক্রাকার বাস সার্ভিস ঢাকার চাকা ঠিক ওর উবারের সামনেই শরীরটা বাঁকা করে দাঁড়িয়ে আছে পথ রোধ করে। উফ, বিকেলবেলা অফিস ছুটির পর গুলশানের রাস্তাগুলোতে যে কি বিশ্রি রকমের জ্যাম হয়! নাহ, আরেকটু সময় হাতে নিয়ে বের হওয়া উচিত ছিল। লাবনী চশমাটা চোখে দিয়ে সেলফোনে সময় নিয়ে উত্তর লিখল-‘আই নিড ফিফটিন মিনিটস মোর।’ টেক্সটটা পাঠিয়ে দিয়ে আবার লিখলো-‘ইন জ্যাম।’

টুং শব্দের উত্তর আসতে দেরি হল না-‘নো ওয়োরি। আই এম টেকিং আ ক্যাপুচিনো। টেক ইওর টাইম।’
উত্তরটা দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে ফোন রেখে লাবনী হাতব্যাগ খুলে ভাংতি টাকা গুনে পাশে রাখল। তারপর ফেস পাউডার বের করে আয়নায় নিজেকে দেখল একটু। হাত দিয়ে সামনের চুল ঠিক করল। তারপর ভিকটোরিয়াস সিক্রেটের ছোট্ট পারফিউমটা বের করে কানের দুপাশে স্প্রে করল। দুপুরবেলা একটা মিটিং ছিল মহাখালিতে, ইতালিয় ক্লায়েন্টদের সাথে। সেই বারোটায় রেডি হয়ে বাসা থেকে বেরিয়েছে। আজকে শাড়ি পরা উচিত ছিল কি? নিদেন পক্ষে কুর্তির সাথে একটা ওড়না? ধুর, এসবে কি যায় আসে? অফিসে সে কুর্তি জিনসেই কমফোর্টেবল। ওর অফিসটা ছোট্ট। মোটে ছয় জন কর্মী এখন। বেশির ভাগই মেয়ে। হররোজ বিদেশি ক্লায়েন্টদের সাথে মিটিং থাকে। সারাদিন এদিক ওদিক যেতে হয়। নিজের গাড়ি তো নেই, বাস বা উবারই ভরসা। শাড়ি-টাড়ি বা সালোয়ার ওড়না সামলাতে বিরক্ত লাগে তখন। অবশ্য পোশাক-আশাক নিয়ে এত ভাবারই বা কী আছে? লোকটাকে ইমপ্রেস করার কোন ইচ্ছে নেই ওর। কিছু কথা মুখোমুখি বলা দরকার, তাই আসা। কথাগুলো ফোনেও হয়তো বলা যেত, কিন্তু সেক্ষেত্রে মা ঝামেলা করত খুব। কান খাড়া করে থাকতো শোনার জন্য। কাল রাতেও মুখ গুঁজে প্রপোজাল লেখার সময় পাশে বসে অনেকক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান করে গেছে মা। ‘একবার ভালো করে ছেলেটাকে দ্যাখ না লাবু, সময় নিয়ে কথা বলিস। ভারি ভাল ছেলে। তোর পছন্দ হবেই।’

ল্যাপটপের কী বোর্ড টিপতে টিপতে হেসে বলেছিল লাবনী- কি করে বুঝলে পছন্দ হবেই? তুমিও তো দেখোনি।
-নাজু বেয়ানের বোনের মোবাইলে ছবি দেখেছি। দেখবি? বেয়ানকে ছবিটা তোর হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে বলি?
-কাল তো সামনাসামনি দেখাই হবে। ছবির দরকার কি? -বলে মার দিকে তাকিয়ে সন্দেহভরা গলায় জিজ্ঞেস করেছিল লাবনী- তোমার নাজু বেয়াইনকে আমার ছবি দিয়েছো নাকি?
মা অভিযোগ করতে শুরু করলেন- দিলে তো ভাল হত। আমি ওসব পারি নাকি? হোয়াটসঅ্যাপ ট্যাপ? নাজু বেয়ান নাকি তোকে দেখেও নাই কোনদিন। আমেরিকা থেকে তো আসেই নাই সাত বছর। তোর ফেসবুক আইডি চেয়েছিল। ফেসবুক নাই শুনে খুবই আশ্চর্য হল। এই যুগের মেয়ে, ফেসবুক নাই।
লাবনী ল্যাপটপের ঢাকনা নামিয়ে হাসতে হাসতে বলল, মা এই সব ফেসবুক-টেসবুক মেইনটেইন করার সময় আছে আমার? ওগুলোতে হুদাই সময় নষ্ট। আমার কত কাজ।
মা গাল ফুলিয়েছিলেন শুনে- তোর তো কোন কিছুতেই সময় নাই। বিয়ের জন্যও সময় নাই। কিন্তু বয়স কি আর থেমে থাকবে? বিয়ে-ব্যবসা সব এক সাথেই তো করতে হয় মেয়েদের। আমরা করি নাই? আমিও তো চাকরি করছি তোদের নিয়ে। করি নাই?

জ্যামটা ছুটে গেছে। উবার ড্রাইভার স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছে এখন। গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল লাবনী। মাকে বোঝানো মুশকিল যে, তার সমস্যা এই ব্যবসা না। সমস্যা হল যে তার বিয়ে-টিয়ে করতেই ইচ্ছে করে না। গোটা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সে কখনো কোন ছেলের সাথে ভাল করে মিশতে পারেনি। রাস্তাঘাটে কোন সুন্দর হ্যান্ডসাম ছেলে দেখলেও তার মনে মুগ্ধতা জাগে না। আশ্চর্যের ব্যাপার যে এই বত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ততার জীবনে কোন ক্রাশ নেই! বন্ধুরা তাকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করে। ছেলেরা ভাবে তার খুব নাক উঁচু। আসলে তা নয়। মাঝে মাঝে সে ভাবে কোন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাবে কিনা। কিন্তু সাহস হয়ে ওঠে না।

গ্লোরিয়া জিনস কফির সামনে উবার থামলে লাবনী আগে থেকে রেডি করে রাখা দেড়শ টাকা বাড়িয়ে দিল ড্রাইভারের দিকে। ড্রাইভার জিপিএস বন্ধ করে বলল- একশ সাইত্রিশ টাকা ম্যাডাম।
-রেখে দেন বাকিটা। -এই বলে গাড়ি থেকে নেমে একটু দাঁড়াল সে। কুঁচকে যাওয়া কুর্তিটা টেনেটুনে সোজা করল। ঘাড়ের ওপর চুলগুলোকে হাত দিয়ে ঠেলে দিলো পেছনে। তারপর কাঁচের দরজা ঠেলে গট গট করে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়লো লোকটাকে। ডান দিকের কোনের টেবিলে বসার কথা। সাদা-নীল স্ট্রাইপ শার্ট। সামনের টেবিলে এক কাপ ক্যাপুচিনো। কফির দোকানে এ-ই একমাত্র মানুষ যে একা বসে আছে। চারদিকে তাকিয়ে নি:সন্দেহ হয়ে এগিয়ে গেল সে। লোকটাও তার দিকে তাকিয়ে নার্ভাস ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। মার নাজু বেয়ান ঠিক বলেননি। লোকটা মোটেও পছন্দ হবার মত নয়। খুবই সাধারণ চেহারা। ভাঙাচোরা গড়ন। একটু আনস্মার্ট গোছের। চেহারায় আত্মবিশ্বাসের অভাব প্রকট। সারাদিন নানা ধরনের মানুষের সাথে মেশে লাবনী। এই শহরে বায়িং হাউজের বিজনেস করছে আজ দুই বছর হল। কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি বিজনেসটা একা দাঁড় করাতে। মানুষ চিনতে ওর ভুল হয় না এখন।

টেবিলের সামনে গিয়ে লাবনী গলা খাঁকারি দিয়ে বলল-বসব?
-জি জি প্লিজ-নার্ভাস ভঙ্গিতে বলল লোকটা। লাবনী বলল, সরি একটু দেরি হয়ে গেল। রাস্তায় খুব জ্যাম ছিল।
-না না সমস্যা নাই। -তাড়াতাড়ি বলল লোকটা- ঢাকার রাস্তার কোন ঠিক-ঠিকানা নাই। দেরি তো হতেই পারে।
তারপর দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ। লোকটাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছিল লাবনী। বিষন্ন মুখ। চোখগুলো উদভ্রান্ত। আনমনা। শেভও করেনি আজ। কি আশ্চর্য! হবু স্ত্রীর সাথে দেখা করতে এমন এলেবেলে ভাবে কেউ আসে? এক মিনিট অপেক্ষা করে নিজেই হাত তুলে ওয়েটারকে ডাকল সে। এক কাপ কাফে লাতে দিতে বলল, সাথে ব্রাউন সুগার আলাদা। তারপর লোকটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল- আপনি আর কিছু নেবেন?
-না না-চিন্তামগ্ন লোকটা চমকে উঠল এতক্ষণে। -আমি আগেই নিয়েছি। এই যে। ক্যাপুচিনো।
ধুর! লাবনী মনে মনে বিরক্ত হল খুব। ওর আসলে ফোনেই কথা সেরে নেয়া উচিত ছিল কাল। শুধু শুধু সময় নষ্ট। আজকে একটা শিপমেন্ট ফাইনাল হবার কথা ছিল। কাজটা পেন্ডিং রেখে এসেছে। ফালতু। অবাক ব্যাপার, কাফে লাতে আসা পর্যন্ত কোন কথাই আর বলল না লোকটা। কফিতে চুমুক দিয়ে গেল আপন মনে। একবার যেন একটা দীর্ঘশ্বাসও ফেলতে শুনল লাবনী। মাঝখানে একবার লক্ষ করল সে কাচেঁর জানালার বাইরে তাকিয়ে কী যেন দেখছে গভীর মনোযোগে। আজব! এখানে কেন এসেছে তা কি ভুলে গেছে নাকি? অবশেষে লাবনী অধৈর্য হয়ে কফিতে চিনির প্যাকেট খুলে মেশাতে মেশাতে গম্ভীর গলায় বলল-দেখেন, আমার কিছু কথা বলার ছিল। আমার মনে হয় ভনিতা না করে বলে ফেলাই ভাল।
চমকে উঠল লোকটা-ও, আপনারও কিছু বলার ছিল?
এবার লাবনীর অবাক হবার পালা। রেগে গেল সে- কেন, আমার কিছু বলার থাকতে পারে না বুঝি?
-নিশ্চয় থাকতে পারে। কিন্তু কিন্তু, আমি ভাবছিলাম-লোকটা তোতলাতে থাকে এখন।
-কি? কি ভাবছিলেন? –প্রায় ধমকে ওঠে লাবনী।
-না মানে বলছিলাম যে আমারও একটা জরুরি কথা ছিল। -একটু গলা পরিস্কার করে নিল লোকটা- মানে বলতে চাইছিলাম যে আপনি আমার মত একজনকে বিয়ে করতে রাজি হয়েননা। প্লিজ। এইটাই। ব্যস।
-মানে? –রীতিমত আকাশ থেকে পড়ল লাবনী। এ তো তার চিন্তাতেও ছিল না। বাহ। খুবই ভাল কথা। ব্যাপারটা তো খুবই সহজ হয়ে গেল এখন ওর জন্য। একটু স্বস্তি পেতে শুরু করল সে। এতক্ষণের টেনশন থেকে মুক্ত হয়ে এবার নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দিয়ে কফির কাপে চুমুক দিল সে। কুষ্মান্ডটাই বলুক দেখি কি বলতে চায়।
-মানে আমি আসলে আপনার যোগ্যই না। আমার সিভি অবশ্য খুব ভাল। হয়তো আপনার বাসায় সিভিটা খুব পছন্দ হবে। ফ্যামিলি ভাল। আমাদের টাকা পয়সা আছে। নিজেদের বাড়ি। বাবা ব্যবসা রেখে গেছেন, এখন ভাইয়েরা চালায়। আমার একটা বিদেশি ডিগ্রিও আছে। তবে সত্যি বলতে কি টাকা পয়সা খরচ করলে ওরকম ডিগ্রি বিদেশে কিনতে পাওয়া যায়। আমি ওরকম মেধাবী কখনোই ছিলাম না। ব্রাইট স্টুডেন্ট হিসেবে আমার কোন সুনাম নাই।
লাবনী এবার নড়ে চড়ে বসে। বেশ ইন্টারেস্টিং। যতটা অনাকর্ষণীয় মনে হয়েছিল লোকটাকে, এখন আর ততটা মনে হচ্ছে না। যদিও হড়বড় করে কী সব বলে চলেছে যা শোনার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিলনা আগে। দেখা যাক না কী হয়।
-তো মানে-লোকটা তার দিকে চোখ তুলে তাকাল এই প্রথম -মানে আমি হলাম বাসার ছোট ছেলে। সবচেয়ে অপদার্থ ছেলে বলা যায়। পড়াশোনায় ভাল ছিলাম না। খেলাধূলায় না। কোন এক্সট্রা কারিকুলামে না। ঘরের কোন কাজ-কর্মেও না। কোন গুণ নাই আমার। আমি খুবই অলস ধরনের। ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছা করত না বলে নিয়মিত ক্লাস মিস হত। বেসরকারি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম সেখান থেকে মোটা অংকের জরিমানা করা হয় এজন্য। চিঠি আসে যে জরিমানা না দিলে পরীক্ষায় বসতে দেবে না। ক্লাসে পার্সেন্টেজ নাই। বড় ভাই খুব রাগারাগি করল সেদিন। পারলে গায়ে হাত ওঠায়।
-তারপর?-কফিতে চুমুক দিতে দিতে খুবই আগ্রহের সাথে শুনছিল লাবনী।
-মার কান্নাকাটির কারণে শেষ পর্যন্ত সমাধান হল। বিশ্ববিদ্যালয় টিসি দিয়ে দেবার পর আমাকে বিবিএ পড়ার জন্য এবার মালয়েশিয়ায় পাঠানো হল। ওই যে বললাম না আজকাল এসব বিদেশি ডিগ্রি কোন ব্যাপার না। টাকা থাকলেই হল। তো মালয়েশিয়া গিয়ে আরও অবনতি হল আমার। কেরালার এক বন্ধুর সাথে থাকতাম হোস্টেলে। সেও আমার মত বিন্দাস। পড়াশোনা করে না। খালি ঘোরাঘুরি করতে ভাল লাগে। ঘোরাঘুরির বাতিক ওর কাছ থেকেই পাওয়া। আমার ওই বন্ধুর সাথে আড়াই বছরে জাভা, বোর্নিও, বালি, লুম্বক কত কত জায়গায় ঘুরে বেড়ালাম। পাহাড়ে ট্রেকিং করলাম একবার। পায়ের ছাল চামড়া উঠে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম তিন দিন। আর একবার নৌকা নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে কোটা কিনাবালু গেলাম। জঙ্গলে ক্যাম্প করে থাকলাম সাত দিন। ঘোরাঘুরির খরচ ওঠানোর জন্য দুই বন্ধু ক্লাস বাদ দিয়ে ফাস্ট ফুড শপে কাজ করতাম। হাতে কিছু টাকা জমলেই হাওয়া হয়ে যেতাম। আচ্ছা আপনি সমুদ্রের বুকে ভাসতে ভাসতে গোলাপি ডলফিনের নাচানাচি দেখেছেন কখনো? ডলফিনরা না এক রকমের অদ্ভুত সূরে গান গায়। ভীষণ নি:সঙ্গ সেই সুর। যেন তাদের বুক ভরা হাহাকার। জীবনে ভুলবেন না সেই গান একবার শুনলে।

-বাহ, মজা তো-লাবনী মুগ্ধ কন্ঠে বলল।
-মজা না মোটেও। -লোকটাও হাসল এবার-বুঝতেই পারছেন। এই সব ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে টিউশন ফি দেয়া হয়নি। টাকা বাকি পড়ার কারণে ওখানেও পরীক্ষা দিতে দেবে না বলে জানাল। বড় ভাই তো একেবারে অগ্নিশর্মা। এরকম ভাই থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল। কাঁহাতক এই সব সহ্য করা যায়। যাই হোক, বিস্তর গন্ডগোল হল এ নিয়ে। তারপর মা নিজের গয়না বিক্রি করে কিছু টাকা পাঠালেন। ফোনে কান্নাকাটি করে অনুরোধ করলেন আমি যেন অন্তত ডিগ্রিটা নিয়ে বাড়ি যাই। মার অনুরোধে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় বসলাম। খুবই খারাপ রেজাল্ট হল স্বাভাবিক। ক্লাস টাস করা হয়নি। পড়াশোনাও না। তো রেজাল্ট তো আমার দরকার নাই। আমার দরকার একটা সার্টিফিকেট। সেটা নিয়ে দেশে ফিরে আসলাম।
-আর আপনার কেরালার বন্ধু?
-দীপক? দীপক ফটোগ্রাফি করবে বলে নেপালে চলে গেল। তার বাবা সাউথের বিশাল ব্যবসায়ী। টাকার কুমির। ওর সাথেও আর যোগাযোগ নাই এখন।
-কেন?
-আমি এরকমই। আমার কোন কিছু টেকে না। কোন সম্পর্কও না। দিনগুলো চলে যাচ্ছে, যাক না। মানে আমার বড় ভাই বলে, আমার নাকি কোন ড্রাইভ নাই। কোন উদ্যম নাই। এই আর কি!
কিছুক্ষণ চুপ থেকে লাবনী বলল-আচ্ছা আমরা কি একটা গার্লিক মাশরুম সালাদ নিতে পারি? আমার খিদে পেয়েছে।

শুনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল লোকটা-নিশ্চয়। ভাববেন না, আমার কাছে টাকা আছে। মা দিয়ে দিয়েছেন আসার সময়।

শুনে অনেক দিন পর খিল খিল করে হাসল লাবনী। বলল-আমার কাছেও আছে। দাঁড়ান অর্ডারটা দেই, তারপর বাকিটা শুনব।

ওয়েটার অর্ডার নিয়ে গেল। সপ্তাহের শেষ দিনের এই সন্ধ্যায় গ্লোরিয়া জিনসে তরুণ-তরুণীদের ভিড়। চারপাশে কলকল করছে তারা। হাসাহাসি আর হইচই এর শব্দে টেকা দায়। নিজেদেরকে এখানে একটু বেমানান লাগছে কেন যেন। ওরা তো আসলে এই বয়সটা পার হয়ে এসেছে। এই উচ্ছসিত তারুণ্য। এই মুখরিত বয়স। সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে লাবনী বলল-তারপর?

-তারপর আর কি। এই কোয়ালিফিকেশন নিয়ে চাকরি বাকরির কোন আশা নাই। কত এমবিএ বিবিএ পথে পথে ঘুরছে। বড় ভাই বললেন তাঁর ব্যবসায় সাহায্য করতে। একটা পদবীও দিলেন তিনি। এসিসটেন্ট ম্যানেজার। আমি অফিসে বসি। মাস শেষে বেতন পাই। তাই বলে ভাববেন না আমার অফিসে কোন পদমর্যাদা আছে। আমি বড়জোর ভাইয়ের পিয়নের সমকক্ষ। আমাকে কোন দায়িত্বপূর্ণ কাজ দিতে ভরসা পায় না ভাই। টুকটাক ফরমাশ পালন করি। ভাইয়ের সাথে সাথে থাকি। মিটিং-টিটিং এ বসে থাকি ভাইয়ের পাশে। এই আর কি।

লোকটার কথা শেষ হলে আবার নীরবতা। কফির ধোঁয়াও মিশে গেছে হাওয়ায়। কাপের নিচে এক টুকরো মেঘের মতো পড়ে আছে কেবল ক্রিমটুকু। পাশের টেবিলে ঠিক এই সময় জোরে গান গেয়ে উঠল এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে। কারও জন্মদিন পালন করা হচ্ছে। ভীষন হইচই করে কেক কাটছে ওরা। এই চেঁচামেচির মধ্যে লাবনী ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল-আপনার এই কাজ করতে ভাল লাগে?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল লোকটা-নাহ। আমার এসব কিছুই ভাল লাগে না। এই শহরও আমার ভাল লাগে না। আমার খালি দূরে কোথাও চলে যেতে মন চায়। ও হ্যাঁ, কেরালার ওই বন্ধু, দীপক, আমাকে মদ্যপানও শিখিয়েছিল। শিখিয়েছিল কীভাবে মগজটা শুন্য করে ফেলে একটা সারা রাত আকাশের তারা গুণে পার করা যায়। ঝোপঝাড়ে শুয়ে নারকেল গাছের পাতার ফাঁক ফোকর দিয়ে তারা গোনার মজাই অন্য রকম। তারা গুনতে গুনতে পুরা আকাশটা এক সময় আপনার মাথার ভেতর ঢুকে যাবে। রাত বাড়তে দেখবেন তারাগুলা খালি আপনার চোখের সামনে জায়গা বদল করে ফেলছে। যেন ছোটাছুটি করছে একটা বিশাল কালো শুন্য মাঠজুড়ে। এটাও খুব মজা। তো যা বলছিলাম, বেতনের টাকা হাতে পেলে দু’একদিন ভাল মদ পান করি। বাসার ছাদে শুয়ে তারা গুনি। দোতলা বাসের টিকিট করে অকারণে শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরে বেড়াই। রাস্তায় হরেক রকমের মানুষ দেখি। কেউ ভীষণ ব্যস্ত। কারও আবার কোন তাড়া নেই, এককোণে সারাদিন শুয়ে ভিক্ষা করে যাচ্ছে। সমস্ত দিন ভিক্ষা করার পর বা ফুটপাতে তাবিজ বিক্রি করার পর লোকগুলো কোথায় যায়? মাঝে মাঝে তাদের ফলো করি। আশ্চর্য কি জানেন, তাদেরও ঘর আছে। ঘরে কেউ অপেক্ষা করে আছে। তারাও ঘরে ফেরার সময় এটা-ওটা কেনে। একটা প্লাস্টিকের পুতুল। এক হালি কলা। একটা ঝুনঝুনি। আর যাদের ঘর নাই তাদেরও ফুটপাতে বা পার্কে একটা নির্দিষ্ট জায়গা আছে। তারা নিশ্চিন্তে সেখানে গিয়ে ঘুমায়। মানুষ খুব আজব, তাই না? একটা ঠিকানা ছাড়া তাদের চলেই না।

লাবনীর কফির সাথে গার্লিক মাশরুমও শেষ হয়ে গেছে। মাশরুমের ওপর ছিটানো শুকনো মরিচের গুড়োর কারণে প্রচন্ড ঝাল লেগে গেছে ওর। ঠোঁট গোল করে শ্বাস নিচ্ছে এই মুহুর্তে। ওর গোল করা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি ভরা কন্ঠে বলল লোকটা- তাই বলছিলাম, আমাকে বিয়ে করার চিন্তা মাথায়ও আনবেননা আপনি। আপনি উচ্চ শিক্ষিত। স্মার্ট। সেলফ মেইড। ইয়ে মানে আপনি খুব সুন্দরও দেখতে। বাসার লোকের কথায় কনভিন্সড হয়ে হুট করে আমাকে বিয়ে করে ফেললে চরম হতাশায় পড়বেন শেষে। খুব অশান্তি হবে। এসব ব্যাপার ফোনে বলা ঠিক না। তাই ভাবলাম সামনা-সামনিই বলি। নইলে আপনি ভাবতেন আমি বানিয়ে বানিয়ে বলছি। বিশ্বাস করুন, আমি একটুও বানিয়ে বলছি না। আসলেই আমি অপদার্থ। একটা টোটাল ফেইলিউর। আর আমার আসলে কোন ঠিকানা নাই। একজন ভিক্ষুকেরও যা আছে আমার তা নাই।

ঘড়িতে এখন সাতটা। কোন দিক দিয়ে যে দেড়টা ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। জন্মদিন পালন করা ওই দলটির জায়গায় পাশের টেবিলে এসে বসেছে নতুন আরেক দল তরুণ-তরুণী। তারা জোরে জোরে কথা বলতে আর হাসতে শুরু করেছে। তারুণ্যে মুখর কফিশপ থেকে বেরিয়ে লাবনী দেখে গোটা গুলশান এভিনিউ এ মুহুর্তে আলোয় আলোয় ঝলমল করছে। সাঁই সাঁই করে ছুটছে দামি দামি গাড়ি। পথের দুধারে কফি শপ আর রেস্তোঁরায় উপচে পড়া ভিড়। তরুণ তরুণীরা আড্ডা আর হাসিতে মেতে উঠেছে চারদিকে। তার পাশ দিয়ে লাল-নীল বেলুন হাতে হেঁটে গেল একটা কিশোর। ফুটপাতে ওকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ক্রস করে গেল এক দল সুন্দর পোশাক পরা কিশোরী। সামনে এক গাদা শপিং ব্যাগ হাতে কোনমতে গাড়িতে উঠলেন প্রসাধন চর্চিত মধ্যবয়সী এক নারী। হাতে কোন আইসক্রিম নিয়ে বাবার হাত ধরে নাচতে নাচতে চলেছে ফ্রক পরা একটা ছোট্ট বালিকা। হাঁটতে হাঁটতে লাবনী এই সব দেখে আর তার মনটা কেমন করতে থাকে। কী মন খারাপ করা এই শহর! এই শহরটা কেবল এই সফল, স্মার্ট, সুখি আর চৌকস মানুষদের। এ শহর কখনোই ব্যর্থ আর একাকী মানুষদের ভালবাসে না। লাবনীর কোন কথা বলতে হয়নি। বলার প্রয়োজনও হয়নি। তার আগেই ব্যাপারটার সুরাহা হয়ে গেছে। কিন্তু কেন যেন লাবনীরও বলতে ইচ্ছে করছিল খুব। বলতে ইচ্ছে করছিল যে ওর এই স্মার্ট এলিগেন্ট কনফিডেন্ট চেহারার ভেতরে সে নিজেও কত একা, ব্যর্থ আর কত নাজুক। বলতে ইচ্ছে করছিল যে সেই কৈশোরে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার পর থেকে আজ অব্দি কাউকে ভালবাসার কথা, বিয়ে করার কথা, কারও হাত ধরার কথা কল্পনা করতেও বমি আসে ওর। খুব বলতে ইচ্ছে করছিল যে চারদিকে মানুষের এত হাসি, এত আড্ডা, এই সব প্রেম, রোমান্স, জন্মদিন পালন, সংসার, শপিং, জীবনের এই সব প্রাচুর্য আর মাধুর্য দেখলে তার মাথায় আগুন ধরে যায়। তার খালি বিবমিষা হয় এই জীবন নিয়ে। তার খুব অনীহা হয় এই জীবন যাপন করতে। এই মুহুর্তে তারও ইচ্ছে করে পালিয়ে যেতে একটা দোতলা বাসের টিকিট করে দূরে কোথাও। এমন যদি হত, সে একটা ছোট নৌকায় সাদা পাল উড়িয়ে উত্তাল সমুদ্র পার হয়ে গোলাপি ডলফিনের কান্না শুনতে বেরিয়ে পড়তে পারত। গহীন জঙ্গলের ঝোপঝাড়ের পাশে শুয়ে একটা সারারাত আকাশের তারা গুনে কাটিয়ে দিতে পারত যদি, যে তারাগুলো দিকভ্রম ঘটায় আর খালি ছোটাছুটি করে…

জোরে কানের কাছে হর্ন বেজে উঠলে সে চমকে উঠল। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে পুলিশ কনকর্ড প্লাজা পর্যন্ত এসে পড়েছে। লাবনীর হঠাৎ খেয়াল হল যে উবার ডাকা দরকার। মা হয়তো অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। এই জ্যাম ঠেলে এখন ফিরতে হবে সেই মোহাম্মদপুর। কত রাত হয় ফিরতে কে জানে। ব্যাগ খুলে সেলফোনটা বের করল সে। গ্লোরিয়া জিনস এ ঢোকার সময় নিরুপদ্রব থাকার জন্য সাইলেন্ট করে ফেলেছিল ফোনটা। এবার নীরব ফোনটাকে সরব করে সে চমকে উঠল। একি? মার নাজু বেয়ানের ভাগনের এতগুলো আনআনসারড কল? ওই সময়ের মধ্যে? এর মানে কি? আশ্চর্য হয়ে মেসেজ ইনবক্সটা খুলে অনড় হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল সে অনেকক্ষণ। ‘আপনার জন্য সাতটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম ধানমন্ডি গ্লোরিয়া জিনস এ। আপনি আসবেন না সেকথা ভদ্রতা করে অন্তত জানাতে পারতেন। এনিওয়ে, গুড বাই, অ্যান্ড থ্যাংকস।’

ধানমন্ডি গ্লোরিয়া জিনস? অবাক হয়ে পেছন ফিরে একবার তাকাল লাবনী। দূরে ফেলে আসা মানুষের পদচারণায় মুখরিত ঝলমলে গুলশান এভিনিউ এর দিকে শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল ওর। কে ছিলো ওই আশ্চর্য লোকটা? যার সাথে ভুল করে দেখা হয়ে গেল ওর। যার সাথে এতদিন দেখা না হওয়াটাই কেমন একটা ভুল ছিল। ঠিক ওই মুহুর্তে হাতিরঝিলের ওপর হঠাৎ অনেকগুলো আতশবাজি ফুটে উঠল এক সাথে। নয়নাভিরাম ব্রিজগুলোতে খেলা করতে শুরু করল লাল-নীল আলো। ঝিলের জলের ওপর শুরু হয়েছে লেজার লাইট শো। আশপাশের মানুষ আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠছে তা দেখে। কেউ চিৎকার করছে, কেউ মোবাইল বের করে ছবি তুলছে। জীবনের এই বিচিত্র কোলাহলের মাঝে নির্জন ফুটপাতের এক কোণে একটা একাকী গোলাপি ডলফিনের মত দাড়িয়ে রইল লাবনী। তার মাথার ভেতর এখন একটা তারা ভরা শুন্য আকাশ।

The post এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারতো

appeared first on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

Leave a Reply

%d bloggers like this: