নিউজ ডেস্ক।।

ক্ষয়ে যাচ্ছে প্রায় ১৪১ বছরের ইতিহাস বহন করা অনিন্দ্যসুন্দর আলেকজান্ডার ক্যাসল। ভবনটি ‘লোহার কুঠি’ নামেই সমধিক পরিচিত। এর সামনের দুই দিকের দুটি মূর্তির হাত ক্ষয় হয়েছে। লোহার সংযোগগুলো মরিচা পড়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে খসে পড়ছে। তবে ময়মনসিংহ শহরের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ভবনটি রক্ষায় দৃশ্যত কোনো উদ্যোগ নেই।

সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটি পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করলেও এটি রক্ষায় এখনও কাজ শুরু হয়নি। আলেকজান্ডার ক্যাসলটি ময়মনসিংহ শহরের আদালত এলাকায় অবস্থিত।

১৭৮৭ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ময়মনসিংহ জেলা। ময়মনসিংহ শহরের জন্য জায়গা দেন মুক্তাগাছার জমিদার রঘুনন্দন আচার্য। জেলার শতবর্ষ উপলক্ষে মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সুকান্ত সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী শহরে উৎসব পালনের জন্য দ্বিতল এ ভবনটি নির্মাণ করেন। অবশ্য মতান্তরে ময়মনসিংহের তৎকালীন ইংরেজ কালেক্টর আলেকজান্ডারের নামে ১৮৭৯ সালে ভবনটি নির্মিত হয়। শুরুতে এটি মহারাজার বাগানবাড়ি হিসেবে ব্যবহূত হতো। তৎকালীন সময়ে ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটিতে লোহা ব্যবহারের কারণে এটি স্থানীয়দের কাছে লোহার কুঠি নামেও পরিচিত। নানা কারুকার্যে নির্মাণের পর রাজকীয় আসবাবে ভবনটি সজ্জিত করা হয়েছিল।

ইতিহাসখ্যাত বহু ব্যক্তি আলেকজান্ডার প্রাসাদে অবস্থান করেছেন। ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ময়মনসিংহ সফরকালে আলেকজান্ডার ক্যাসলে চার দিন অবস্থান করেন। একই বছর মহাত্মা গান্ধীও এখানে এসেছিলেন। এখানে আরও এসেছিলেন লর্ড কার্জন, চিত্তরঞ্জন দাশ, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, কামাল পাশা, মৌলভী ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু প্রমুখ। আলেকজান্ডার ক্যাসলের সামনের অংশের তথ্য বোর্ড, উইকিপিডিয়া ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ১৯৪৮ সালে আলেকজান্ডার ক্যাসলটি ঘিরে ২৭ দশমিক ১৫ একর জায়গা নিয়ে ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে ক্যাসলটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার হলেও দীর্ঘদিন ধরে ভবনটি কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।

আলেকজান্ডার ক্যাসলটিতে গিয়ে দেখা যায় জীর্ণচিত্র। অরক্ষিত ভবনটির চারপাশে নেই কোনো প্রাচীর। মূল ফটকে একটি সাইনবোর্ডে লিখে রাখা হয়েছে, ‘লোহার কুঠি ভবনের এই স্থানটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য এখানে অবস্থান না করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’

ক্যাসলটির মূল প্রবেশ মুখের সদর দরজার দুই পাশে দুটি মূর্তি ছিল- একটি নারী ও একটি পুরুষ আদলের। এসব মূর্তির হাতসহ বিভিন্ন অংশ নিশ্চিহ্নহ্ন হয়ে গেছে। চারপাশের লোহার কারুকার্যগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খসে পড়ছে।

ভবনের যে অংশে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে সে স্থানটিতে বসে প্রশান্তি খুঁজছিলেন শিক্ষক শাহজাহান মিয়া। তিনি শেরপুর জেলার কাকারেরচর উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক। তিনি বলেন, এখানে কাজে এলে প্রায়ই দৃষ্টিনন্দন স্থানটিতে আসেন। বর্তমানে ইতিহাসখ্যাত স্থানটির দুরবস্থা। এটির সংস্কার ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের দাবি তোলেন তিনি।

ময়মনসিংহের নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট শিব্বির আহমেদ লিটন বলেন, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি জীর্ণ অবস্থায় ধুঁকছে। দ্রুত এটি সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করে দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।

ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ একেএম নাসির উদ্দীন সমকালকে বলেন, ভবনটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। সম্প্রতি গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী জরাজীর্ণ ভবনটি পরিদর্শন করে গেছেন। প্রতিমন্ত্রী স্থাপনাটি সংস্কারের জন্য বরাদ্দের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ শশী লজ জাদুঘরের ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন সমকালকে বলেন, সম্প্রতি আলেকজান্ডার ক্যাসলটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত চিঠি তিনি পেয়েছেন। আলেকজান্ডার ক্যাসলটির সুরক্ষা ও একে দর্শনীয় হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করা হবে।

The post ক্ষয়ে যাচ্ছে ‘লোহার কুঠি’ appeared first on শিক্ষাবার্তা ডট কম.

Leave a Reply

%d bloggers like this: