নিউজ ডেস্ক।।

আজ ১৭ সেপ্টেম্বর, মহান শিক্ষা দিবস। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের শিক্ষা সংকোচন ও বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে ১৯৬২ সালে এ দেশে গড়ে উঠেছিল তীব্র শিক্ষা আন্দোলন। এর পর পেরিয়েছে কয়েক দশক। এ বছর মহামারী আকারে দেখা দেওয়া করোনা ভাইরাস সংক্রমণ স্পষ্ট দেখিয়ে দিয়েছে দেশ স্বাধীন হলেও শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো ধনী-গরিব সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়নি। শহর-গ্রাম ব্যাপক বৈষম্য রয়ে গেছে। শিক্ষা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে কিন্তু বরাদ্দ আশানুরূপ বাড়ছে না। সে দিকে ইঙ্গিত করে শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষা দিবস তখনই সার্থক হবে যখন সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।

১৯৬২ সালের এই দিনে পাকিস্তানি শাসকদের শাসন, শোষণ ও শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে শহীদ হন ওয়াজিউল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, বাবুলসহ নাম না-জানা অনেকেই। তাদের স্মরণে এ দিনকে শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

এ বছর দিবসটি এসেছে ভিন্নতর প্রেক্ষাপটে। করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে বন্ধ রয়েছে সব স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কবে সেগুলো আবার খুলবে তা এখনো অনিশ্চিত। মার্চের পর থেকে বিভিন্ন পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা নেওয়া যাবে কিনা তাও জানা যাচ্ছে না এখনো। করোনা পুরো বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থাকেই সাময়িকভাবে পাল্টে দিয়েছে। দেশে এখন ক্লাসের পরিবর্তে অনলাইন ও টেলিভিশনের মাধ্যমে পাঠদান কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
করোনার কারণে এবার দিবসটি উপলক্ষে কোনো বড় আয়োজন নেই বলে জানা গেছে শিক্ষা প্রশাসন থেকে। তবে আজ না হলেও অন্যদিন দিবসকেন্দ্রিক আয়োজন থাকবে বলে জানিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক।

শিক্ষা দিবস প্রসঙ্গে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ দেশের শিক্ষা ও শিক্ষক আন্দোলনের প্রবীণ নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, এ দেশের স্বাধীনতার নেপথ্যে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০’র নির্বাচনের ভূমিকা অপরিসীম। আমারা শিক্ষা দিবসকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবি করছি। শুধু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দিবস পালন নয়, সর্বস্তরের মানুষ যেন দিবসটি উদযাপন করে সে জন্য এর তাৎপর্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন কমিটির এই সদস্য বলেন, শিক্ষানীতি পুরো বাস্তবায়ন হয়নি সেটা বলা যাবে না। যতটুকু বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল, হয়তো সেখানটায় আমরা পৌঁছতে পারিনি। আমরা শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন ও মনিটরিংয়ের জন্য একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের কথা বলেছিলাম, তা হয়নি। এ কমিটির কাজ ছিল নীতি বাস্তবায়ন, সময়ে সময়ে যুগোপযোগীর জন্য সংস্কারের সুপারিশ করা।

তিনি আরও বলেন, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে শিক্ষকরা অনলাইন, অফলাইনে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষা প্রশাসন থেকে একের পর এক নির্দেশনা জারি করছে। কিন্তু শিক্ষকদের সে জন্য কতটুকু নিরাপত্তা দেওয়া দরকার, একজন বেসরকারি শিক্ষকের কতটুকু সম্মানী পাওয়া দরকার- সেটা কে নিশ্চিত করছে? এখনো শিক্ষকরা বছরের পর বছর বিনা পয়সায় শিক্ষকতা করছেন। সরকার এমপিও দিচ্ছে, নীতি করেছে। তা হলে কেন এখনো অনার্স-মাস্টার্স কলেজের শিক্ষকরা এমপিওহীন থাকবেন?

ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, শিক্ষা দিবস পালন করে কী হবে? দিবস তো একদিনের ব্যাপার। শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই দিন প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এখনো কি এর সুফল আমরা পাচ্ছি? এখনো আমাদের জাতীয় বরাদ্দের কত শতাংশ আমরা শিক্ষায় ব্যয় করি? আমরা বিশ্বমানের শিক্ষার কথা বলছি, বরাদ্দ দিচ্ছি না। কোভিড-১৯-এ আমরা বুঝতে পারছি, আমাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষাব্যবস্থায় কতটা দুর্বলতায় ভুগছি। মোট শিক্ষার্থীর কত শতাংশ অনলাইনে দূরশিক্ষণে অংশ নিতে পারছে? সরকার ইন্টারনেট ফ্রি দেবে, দিচ্ছে, সেটার বাস্তবায়ন কতটুকু?

প্রবীণ শিক্ষাবিদ ড. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, শিক্ষা বাণিজ্য হ্রাস করতে না পারলে শিক্ষায় আমাদের শহর-গ্রাম বৈষম্য কমবে না। শহরের শিক্ষার্থী যে সুযোগ সুবিধা নেয়, সেটা গ্রামের একজন শিক্ষার্থী পায় না। যতদিন এ বৈষম্য না কমবে, আমাদের শিক্ষা একশ্রেণির কাছে সুযোগ হিসেবে থাকবে। এ দিবসের আন্দোলন তো শিক্ষা শোষণের বিরুদ্ধে ছিল। তা হলে এ শোষণের কী প্রতিকার। একটি ফোন/ল্যাপটপ এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় গ্রামের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারে না। এ দিবসের অঙ্গীকার হোক সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।

আইয়ুব খানের শাসনামলে শরীফ কমিশন নামে পরিচিত এসএম শরীফের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন ১৯৫৯ সালের শিক্ষা বিষয়ে প্রতিবেদনে শিক্ষা সংকোচনের পক্ষে গিয়েছিল। এ প্রতিবেদনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে ছাত্র বেতন বর্ধিত করার প্রস্তাব ছিল। এই কমিশন শিক্ষা সংকোচন নীতি কাঠামোতে শিক্ষাকে তিন স্তরে ভাগ করেছিল- প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চতর। ৫ বছরে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও ৩ বছরে উচ্চতর ডিগ্রি কোর্স এবং ২ বছরের স্নাতকোত্তর কোর্সের সুপারিশ ছিল। উচ্চশিক্ষা ধনী শ্রেণির জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এ কারণে এ দেশে ৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।সূতআমাদের সময়

The post শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য স্পষ্ট করেছে করোনা appeared first on শিক্ষাবার্তা ডট কম.

Leave a Reply

%d bloggers like this: