ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলাদেশের ওষুধের বর্তমান বাজার ২৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যার ৬০ শতাংশের বেশি ১০টি কোম্পানির দখলে। এর মধ্যে বার্ষিক হাজার কোটি টাকার বেশি ওষুধ বিক্রি হয় এমন কোম্পানির সংখ্যা সাতটি, যার মধ্যে নতুন সংযোজন ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। দুই বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় প্রবৃদ্ধি ৫০ শতাংশেরও ওপরে। ড্রাগের পরই সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের।

ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছে বহুল বিক্রীত চারটি ওষুধ। এগুলো হচ্ছে অ্যান্টিলেউক অ্যান্টি-অ্যাজম্যাটিক্স (এম-কাস্ট ও ভেন্টিল ইনহেলার সলিউশন), সালফোনাইলুরিয়া এ-ডায়াবস (লিম্পেট, গ্লিমারল ও ডাইমেরল), প্লাটিলেট এগ্রেগ ইনহিবিটরস (ক্লপিড, ক্লপিড এএস, প্যানসিল), সিস্ট অ্যান্টিফাঙ্গাল এজেন্টস (ফ্লুনাক) জাতীয় ওষুধ এবং বেটা ব্লকিং এজেন্ট প্লেইন (টেনোবিস)।

রোগ নিরাময়ের ধরন বা থেরাপিউটিক ক্লাস বিবেচনায় ২০১৯ সালে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত ওষুধ পণ্যের মধ্যে নবম স্থানে ছিল অ্যান্টিলেউক অ্যান্টি-অ্যাজম্যাটিক্স। ওই বছর ওষুধটি বিক্রি হয়েছে ৫৭৮ কোটি টাকার। এই ওষুধের তৃতীয় শীর্ষ বিক্রেতা ছিল ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল। গত বছর বহুল বিক্রীত আরেকটি ওষুধ ছিল সালফোনাইলুরিয়া এ-ডায়াবস।

ওষুধটির ৩৮৮ কোটি টাকার বাজারে দ্বিতীয় শীর্ষ বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ছিল ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল। একইভাবে বহুল বিক্রীত প্লাটিলেট এগ্রেগ ইনহিবিটরস বিক্রিতে প্রথম, সিস্ট অ্যান্টিফাঙ্গাল এজেন্টস জাতীয় ওষুধ বিক্রিতে দ্বিতীয় এবং বেটা ব্লকিং এজেন্ট প্লেইন বিক্রিতে তৃতীয় শীর্ষ প্রতিষ্ঠানও ছিল ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল।

ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের ব্যবসা দ্রুত বৃদ্ধির পেছনের কারণ জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার (ফ্যাক্টরি) মাহবুবুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান কার্ডিয়াক পণ্যের উৎপাদন বেশি করে। এর সঙ্গে নতুন যুক্ত হয়েছে অ্যান্টি-ক্যান্সার ওষুধ। স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি রফতানিও হয় ওষুধটি। কার্ডিয়াকের ক্ষেত্রেও নতুন নতুন পণ্য যোগ হয়েছে। প্রবৃদ্ধির মূল কারণ এ দুটি ওষুধ পণ্য। আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, সেটি হলো আমাদের সরবরাহ চেইন বেশ নিরবচ্ছিন্ন।

উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নতুন প্রকল্প শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, গত দুই-তিন বছরে ২ ও ৩ নম্বর ইউনিট চালু করেছি আমরা। প্রায় সব ধরনের জেনারেল ওষুধ পণ্যের উৎপাদন আমাদের আছে। তবে অ্যান্টি-ডায়াবেটিক ও কার্ডিয়াক পণ্যের বাজারে আমাদের অবস্থান ভালো। পাশাপাশি এখন অ্যান্টি-ক্যান্সার পণ্য যোগ হওয়ায় প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে।

ওষুধের বিক্রি ও ধরন নিয়ে নিয়মিত জরিপ চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্লিনিক্যাল গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআইএ। বহুজাতিক এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ওষুধ বিক্রি হয়েছে মোট ২৩ হাজার ১৮৪ কোটি টাকার। এর মধ্যে হাজার কোটি টাকার ওপরে ওষুধ বিক্রি করে এমন প্রতিষ্ঠান সাতটি।

যার মধ্যে নতুন সংযোজন ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি মোট ১ হাজার ৫৩ কোটি টাকার বেশি ওষুধ বিক্রি করেছে। বিক্রয় প্রবৃদ্ধি ছিল ৫২ শতাংশ। যদিও এর আগের বছর ওষুধের বিক্রি বিবেচনায় শীর্ষ দশ প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও ছিল না ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল।

ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের পর বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি করেছে। ওই বছর তাদের বিক্রয় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০ দশমিক ২২ শতাংশ। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল প্রতিষ্ঠানটির।

হেলথকেয়ারের দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের পেছনে বড় অবদান রেখেছে অ্যান্টিআলসারেন্ট (সার্জেল) ও অ্যান্টিহিস্টামিনস সিস্টেমেটিক (ভিফাস, রোজেলা) জাতীয় ওষুধ। ওষুধ দুটি বিক্রিতে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শীর্ষ অবস্থানে ছিল হেলথকেয়ার।

ব্যবসায় দ্রুত প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে জানতে চাইলে হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজের (বাপি) ট্রেজারার মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের ওষুধের বাজার ১০-১২ শতাংশ হারে বাড়ছে। কোনো কোনো বছরে ১৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়।

এ ধরনের বাজার পরিস্থিতিতে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোও বড় হবে এটাই স্বাভাবিক। এ বাজারে উৎপাদিত পণ্য কমবেশি সব প্রতিষ্ঠানেরই এক। হেলথকেয়ার কোনো পণ্য প্রথম বাজারে নিয়ে এসেছে এমনটা নয়। আমি মনে করি, হেলথকেয়ারের কর্মীবাহিনী তুলনামূলক বেশি উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করছে বলেই ব্যবসাকে টেকসই করতে পেরেছে। আমাদের কর্মীরা হেলথকেয়ারকে নিজের প্রতিষ্ঠান মনে করেই কাজ করে। আর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থাও হেলথকেয়ারকে সুসংহত রেখেছে।

আইকিউভিআইএর ২০১৯ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্কেট শেয়ার বা বাজার হিস্যায় বেশ কয়েক বছর ধরেই শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। ওষুধ বিক্রি বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটির র্যাংক বা অবস্থান এখনো প্রথম। কিন্তু প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় শীর্ষ দশের মধ্যে নবম অবস্থানে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

আইকিউভিআইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ওষুধ বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এর আগের বছর বিক্রিতে ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের হেড অব মার্কেটিং আহমেদ কামরুল আলম বলেন, ওষুধ শিল্পে প্রবৃদ্ধি এখনো দুই অংকে আছে, যা খুবই ইতিবাচক। এটা আভাস দেয় যে শিল্প সঠিক পথেই এগোচ্ছে। কভিড-১৯ চলতি বছরের তিন-চার মাস শিল্পকে কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে।

স্কয়ারের কিছু কি-সাকসেস ফ্যাক্টর আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ওষুধ যদি কার্যকর না হয় তাহলে সেটা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। চিকিৎসকরা আমাদের ওষুধের ওপর আস্থা রেখেছেন, কারণ স্কয়ারের পণ্য প্রেসক্রাইব করলে রোগীরা উপকৃত হন। এ আস্থার কারণেই আমরা ব্র্যান্ড হিসেবে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে যেতে পেরেছি।

বিক্রির পরিমাণে শীর্ষ দশের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ২০১৯ সালে ২ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি করেছে। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ১৯ শতাংশ। আগের বছর ১৮ দশমিক ৭১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির। প্রবৃদ্ধিতে গত বছর সপ্তম অবস্থানে ছিল ইনসেপ্টা। গত বছর প্রবৃদ্ধিতে ষষ্ঠ অবস্থানে ছিল তৃতীয় সর্বোচ্চ বিক্রেতা বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক ও কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহ বলেন, বেক্সিমকোর সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির চিত্র খুবই ভালো। এ সফলতার চাবিকাঠি হলো গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ। সে সম্প্রসারণগুলো এখন পর্যায়ক্রমে উৎপাদনে গেছে। এটাই আমাদের সফলতার মূল চাবিকাঠি। আরো অনেক কোম্পানি আছে যারা ভালো করছে।

২০১৯ সালে বিক্রির পরিমাণ বিবেচনায় চতুর্থ থেকে দশম অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে যথাক্রমে হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, রেনাটা, অপসোনিন, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল, অ্যারিস্টোফার্মা, এসিআই ও এসকায়েফ।

ওষুধ বিক্রির পরিমাণ বিবেচনায় ২০১৯ সালে নবম অবস্থানে আছে এসিআই। আর প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় দশম অবস্থানে আছে প্রতিষ্ঠানটি। ওই বছর প্রতিষ্ঠানটির বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯৪১ কোটি টাকা এবং প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

জানতে চাইলে এসিআই হেলথকেয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকতা (সিইও) এম মহিবুজ জামান বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতিনিয়ত গবেষণার মাধ্যমে নতুন ও কার্যকর ওষুধ পণ্য সরবরাহ করছে এসিআই। মহামারীর সময়েও এসিআই কভিড-১৯ সম্পর্কিত আটটি পণ্য চালু করতে সক্ষম হয়েছে।

পাশাপাশি এ পরিস্থিতিতে আমরা বেশকিছু নতুন পণ্য আনতে পেরেছি। মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন ও স্বতন্ত্র বিপণন কৌশল আমাদের প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ভোক্তার কাছে নিরাপদ ওষুধ পণ্যগুলো যাতে পৌঁছতে পারে, সে বিষয়ে আমরা সব সময়ই সচেতন থাকি। এজন্য ভোক্তাদের কাছে সব সময়ই আস্থার শীর্ষে থাকে এসিআই।

ওষুধ শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানের পারদর্শিতা তিনটি আঙ্গিকে বিবেচনা করা হয়। ব্যবস্থাপনা, পণ্য ও নীতি—এই তিন ক্ষেত্রে পারদর্শিতার সমন্বয়ে যে প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে যেতে পারে তারাই বাজারে টিকে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের বাজার হিস্যাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। যে প্রতিষ্ঠানগুলোর অবনতি দেখা যাচ্ছে তারা সঠিক সময়ে সঠিক পণ্যটি বাজারে সরবরাহ করতে পারেনি, সে কারণে তারা পিছিয়েছে।

অনেক প্রতিষ্ঠানে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি ছিল। যারা র্যাংকিংয়ে পিছিয়েছে তারা বাজারের চাহিদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পোর্টফোলিওটা সেভাবে সাজিয়ে তুলতে পারেনি। ওষুধ শিল্পের বাজার খুবই ডায়নামিক, এখানে দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ার প্রয়োজন সব সময়ই থাকে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: