<

p style=”text-align: justify;”>চট্টগ্রাম ব্যুরো: করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শুরুতে চট্টগ্রামে চিকিৎসায় বেহাল পরিস্থিতিতে একদল উদ্যমী তরুণের গড়ে তোলা আইসোলেশন সেন্টারের তিনমাসের কর্মযজ্ঞের সমাপ্তি টানা হয়েছে। শুরু থেকেই করোনায় আক্রান্তদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই আইসোলেশন সেন্টারের উদ্যোক্তারা গত তিনমাসে আয়-ব্যয়ের হিসাবও দিয়ে গেছেন। তারা বলেছেন, সংকটময় পরিস্থিতিতে হাসপাতাল কিংবা আইসোলেশন সেন্টার বানিয়ে ব্যবসা করার কোনো অভিযোগ যাতে না ওঠে, সেজন্য তারা স্বচ্ছতার সঙ্গেই আয়-ব্যয়ের হিসাবটি জনসম্মুখে প্রকাশ করেছেন।

চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহরের পোর্ট কানেকটিং সড়কে প্রিন্স অব চিটাগং নামে একটি কমিউনিটি সেন্টারে ১০০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টারটির যাত্রা শুরু হয় গত ১৩ জুন। করোনার সংক্রমণের পর চট্টগ্রামে যখন চিকিৎসা নিয়ে হাহাকার শুরু হয় তখনই এই আইসোলেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠাই এগিয়ে আসেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও সংস্কৃতিকর্মী মোহাম্মদ সাজ্জাত হোসেন। এসময় তার সঙ্গে যুক্ত হন আইনজীবী জিনাত সোহানা চৌধুরী, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি, ছাত্রলীগ নেতা গোলাম সামদানি জনি, মিজানুর রহমানসহ সংগঠনটির একদল নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ।

করোনা আইসোলেশন সেন্টার, চট্টগ্রামের প্রধান উদ্যোক্তা সাজ্জাত হোসেন সারাবাংলাকে জানান, গত তিনমাসে করোনায় আক্রান্ত এবং উপসর্গ আছে এমন ৭৬৫ জন রোগীকে আইসোলেশন সেন্টারে বিনামূল্যে সেবা দিয়েছেন। এর মধ্যে কমপক্ষে ৪০০ জনকে আইসোলেশন সেন্টার থেকেই সুস্থ করে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। শুধু চিকিৎসক কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে সেবা নয়, ওষুধপত্র, দুইবেলা খাবার-নাস্তাও দেওয়া হয়েছে বিনামূল্যে। সংকটাপন্ন রোগীদের পরিবহনে অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ১৩ জন চিকিৎসাধীন ছিল। এর মধ্যে ১০ জনের নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ এসেছে। তাদের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। বাকি তিনজনের আবারও পজিটিভ আসায় তাদের সরকারি জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

সাজ্জাত বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালগুলোতে যখন ঠিকমতো চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল না, বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালগুলো যখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তখন ২৪ মে আমি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে একটি আইসোলেশন সেন্টার গড়ে তোলার ইচ্ছার কথা জানাই। রাজনৈতিক সহকর্মী-সুধীজনেরা আমার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। মূলত সবার সহযোগিতায় আমরা এই সেন্টারটি গড়ে তুলি এবং তিনমাস ধরে চালু রাখি। কাজ করতে গিয়ে আমি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। আমার অনেক সহকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। সর্বশেষ অন্যতম উদ্যোক্তা গোলাম সামদানি এবং একজন স্বেচ্ছাসেবকের নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ এসেছে।’

প্রধান সমন্বয়ক নুরুল আজিম রনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা গত তিনমাসে ৫১ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছি। আমাদের এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৪৭ লাখ টাকা। ব্যাংকে আছে ৪ লাখ টাকা। কিন্তু চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন-ভাতাসহ আনুষাঙ্গিক খরচ বাকি আছে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকার মতো। ঘাটতি আছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। আমরা সমাজের বিত্তবান লোকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছি।’

আইসোলেশন সেন্টার বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রনি বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন, চট্টগ্রামে করোনা পরিস্থিতিতে যত আইসোলেশন সেন্টার হয়েছে, সবচেয়ে বেশি রোগীকে সেবা আমরাই দিয়েছি। কিন্তু আমাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। আর্থিক সংকট আছে। আমরা যে কমিউনিটি সেন্টারটি ব্যবহার করেছি, সেটার মালিক আমাদের বিনা ভাড়ায় দিয়েছেন। সেটা ব্যবহারের জন্য আমরা যে চুক্তি করেছিলাম, এর মেয়াদ শেষ হয়েছে। কমিউনিটি সেন্টার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মেয়াদ আরও বাড়িয়ে মালিকের লোকসান হোক এটা আমরা চাইনি। এরপরও বলছি, আমরা একমাস দেখব। যদি আবারও সেরকম পরিস্থিতি আসে, তাহলে আমরা আবারও আইসোলেশন সেন্টার সুবিধাজনক জায়গায় চালু করব। অন্যথায় আমাদের যেসব চিকিৎসা সরঞ্জাম আছে সেগুলো কোনো বেসরকারি দাতব্য চিকিৎসালয়ে দান করব।’

এদিকে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) করোনা আইসোলেশন সেন্টারের শেষ কর্মদিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবেই পার হয়েছে। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমান। চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আ ম ম মিনহাজুর রহমান, আইএমএস গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর আবু, নগর আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী, হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম এ সময় বক্তৃতা করেন।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, ‘এই আইসোলেশন সেন্টারটি আমাদের একটি শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। তারা কীভাবে সফল হলো, এটাই আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। আমরা এটাকে অনুসরণ করতে পারি।’

হাসান শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘করোনার শুরুতে দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে আলো হয়ে এসেছিল এই আইসোলেশন সেন্টার। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা কঠিন যাত্রাপথের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা প্রমাণ করেছে, শুধু মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছাকে পুঁজি করে কোনো ধরনের পূর্ব প্রশিক্ষণ ছাড়াই কীভাবে স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের পাশে থাকা যায়।’

আ ম ম মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘এই আইসোলেশন সেন্টার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সবাই আমার প্রাণের সংগঠন, বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মী। দেশের মানুষ যখন সংকটে পড়ে, বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাই সবার আগে এগিয়ে আসে, এটাই আবারও প্রমাণ হয়েছে। এই দুর্যোগে চট্টগ্রামের মানুষ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতো একজন নেতার অভাববোধ করছিলেন। তখন উনার আদর্শের কর্মীরাই মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সেই অভাব ঘোচানোর চেষ্টা করে গেছেন।’

শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, ‘করোনা সংক্রমণের পর থেকে এই আইসোলশন সেন্টারে কাজ করতে এসে ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী আক্রান্ত হয়েছে। তবু তারা রোগীদের সেবা করতে পিছপা হয়নি। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

প্রধান উদ্যোক্তা সাজ্জাত হোসেনের সভাপতিত্বে এবং প্রধান সমন্বয়ক নুরুল আজিম রনির পরিচালনায় অনুষ্ঠানে আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরেন মুখপাত্র জিনাত সোহানা চৌধুরী।

The post ৩ মাসের কর্মযজ্ঞের সমাপ্তি টানলেন সেই উদ্যমী তরুণরা

appeared first on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

Leave a Reply

%d bloggers like this: